সময় ভ্রমণকারীর ডায়েরি : অষ্টম অধ্যায় — হাতিবাগানের অভিশপ্ত বাড়ি

 হাতিবাগান—কলকাতার এক পুরনো এলাকা। আজকের ব্যস্ত মার্কেট, ঠেলাগাড়ি, ভিড়ভাট্টার আড়ালে লুকিয়ে আছে অজস্র গল্প। তবে যে বাড়িটার কথা বলছি, সেটা আজও ভাঙা, অন্ধকার আর পরিত্যক্ত। কেউ সাহস করে রাতে তার সামনে দাঁড়ায় না। কারণ শোনা যায়, ভেতর থেকে শিকলের শব্দ, মহিলার কান্না, আর—হাতির চিৎকার ভেসে আসে।

সেই রাতেই আমি ঠিক করলাম, ওই বাড়ির রহস্য আমাকে জানতে হবে। হাতে ছিল আমার টাইম-ডিভাইস। রাত বারোটা বাজতেই আমি ভেতরে পা রাখলাম।

অভিশপ্ত প্রাসাদে প্রবেশ

ভাঙা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ চারদিক ঘুরতে শুরু করল। আমি বুঝলাম, সময় বদলাচ্ছে। চোখ খুলে দেখি—আমি আর ২০২৫-এ নেই, দাঁড়িয়ে আছি আঠারো শতকের এক জমিদারবাড়ির আসরে।

সোনার ঝাড়বাতি ঝলমল করছে, চাকর-বাকররা ছুটে বেড়াচ্ছে, অথচ তাদের মুখে ভয়। মঞ্চে বসে আছে এক ভয়ংকর চেহারার জমিদার।

জমিদার হাঁক দিলেন—
“হাতি আনো! আজ আবার আমাদের শক্তির প্রদর্শনী হবে।”

মুহূর্তের মধ্যে বিশাল এক হাতিকে আনা হলো। তার গলায় বাঁধা শিকল, চোখে জল। জমিদারের ইশারায় চাকররা গ্রামের কয়েকজন গরিব মানুষকে টেনে হিঁচড়ে এনে সামনে দাঁড় করালো।

“যে খাজনা দিতে পারবে না,” জমিদার হাঁক দিলেন, “তার জীবন শেষ হবে এই হাতির পায়ের নিচে।”

আমি হতবাক হয়ে দেখলাম, এক বৃদ্ধ কৃষককে হাতির সামনে ফেলে দেওয়া হলো। হাতি ছটফট করছিল, কিন্তু চাকররা লোহার কাঁটা দিয়ে তাকে ক্ষেপিয়ে তুলল। এক মুহূর্তেই কৃষকটি পিষে গেল হাতির তলায়।

অভিশাপের সূত্রপাত

ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্যে থেকে এক বয়স্কা মহিলা চিৎকার করে উঠলেন—
“ও জমিদার! তুমি আজ নিরপরাধের রক্তে হাত রাঙালে। মা কালীকে সাক্ষী রেখে বলছি, তোমার পরিবার ধ্বংস হবে। এই বাড়ি হবে অশান্তির জায়গা। আর যে হাতি দিয়ে তুমি মানুষ মারলে, সেই হাতির আত্মাই হবে তোমার অভিশাপ।”

সবাই হাসল, কিন্তু জমিদারের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

হঠাৎ বাতাসে অদ্ভুত কাঁপুনি এলো। হাতিটা গর্জে উঠল, শিকল ছিঁড়ে ফেলল, আর জমিদারের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মঞ্চ কাঁপতে লাগল, আর ঠিক তখনই সময় থেমে গেল…

ফিরে আসা

চোখ খুলে দেখি আমি আবার ভাঙা হাতিবাগানের বাড়ির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি। চারিদিক অন্ধকার, শুধু বাতাসে ভেসে আসছে শিকলের টানাটানি আর সেই ভয়ঙ্কর হাতির চিৎকার।

আমি বুঝলাম—এ বাড়ির অভিশাপ আজও শেষ হয়নি। জমিদার পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের লোভ আর নিষ্ঠুরতার ছাপ থেকে গেছে দেয়ালের ভেতরে। আর হাতির আত্মা—সে আজও ঘুরে বেড়ায়, প্রতিটি রাতে।

সেদিন আমি দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু আজও মাঝে মাঝে রাতে চোখ বন্ধ করলে, সেই শিকলের শব্দ আর হাতির গর্জন আমার কানে বাজে।


শেষে শিক্ষা
লোভ, নিষ্ঠুরতা আর অন্যায় যত বড়ই হোক, শেষমেশ তার শাস্তি নেমে আসে। হাতিবাগানের বাড়ি তারই প্রমাণ—যেখানে অতীতের রক্ত আজও চিৎকার করে ওঠে।


নবম অধ্যায়
“শোভাবাজার রাজবাড়ির গোপন দরজা”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ